বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ২০২৬ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে চট্টগ্রাম রয়্যালস। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে দলটির মালিকানা ছেড়ে দেন আগের মালিকপক্ষ। হঠাৎ করেই পুরো দায়িত্ব নিতে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এবারের বিপিএলে চট্টগ্রাম রয়্যালস হয়তো প্রতিযোগিতায় টিকতেই পারবে না। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে সব ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে দলটি।
বিপিএল ২০২৬-এর আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের অস্থির প্রস্তুতি
বিপিএল ২০২৬ শুরুর আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের স্কোয়াড ছিল প্রায় এলোমেলো। চুক্তি জটিলতা, বিদেশি ক্রিকেটারদের অনিশ্চয়তা এবং টিম ম্যানেজমেন্টে পরিবর্তনের কারণে দলটি পুরোপুরি প্রস্তুত হতে পারেনি। প্রথম ম্যাচে মাত্র দুইজন বিদেশি ক্রিকেটার নিয়ে মাঠে নামে চট্টগ্রাম রয়্যালস। এত কম বিদেশি শক্তি নিয়ে মাঠে নামা বিপিএলের মতো প্রতিযোগিতায় খুবই বিরল ঘটনা।
মাঠের পারফরম্যান্সে চমক
সব সীমাবদ্ধতার পরও চট্টগ্রাম রয়্যালস মাঠে নেমে দেখিয়েছে অন্য রকম দৃঢ়তা। চার ম্যাচ শেষে তিনটি জয় নিয়ে তারা উঠে এসেছে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের সঙ্গে সমান ছয় পয়েন্ট থাকলেও Net Run Rate এগিয়ে থাকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম রয়্যালস। দলের এই পারফরম্যান্স অনেক বিশ্লেষককেই অবাক করেছে।
শক্তির জায়গা কোথায়
স্থানীয় ক্রিকেটারদের অবদান
চট্টগ্রাম রয়্যালসের সাফল্যের বড় কারণ স্থানীয় ক্রিকেটারদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। ব্যাটিং অর্ডারে দায়িত্ব নিয়ে খেলছেন অভিজ্ঞ ও তরুণদের মিশ্রণ। বোলিং ইউনিটেও স্থানীয় পেসার ও স্পিনাররা নিয়মিত উইকেট তুলে নিচ্ছেন।
বোলিং আক্রমণে মুগ্ধর ভূমিকা
চলতি বিপিএল ২০২৬ আসরে চট্টগ্রাম রয়্যালসের পেস ইউনিটের অন্যতম ভরসা ছিলেন মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ। চার ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি দলের সেরা বোলারদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। নতুন বলে সুইং, মাঝের ওভারে নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেন্থ—সব মিলিয়ে মুগ্ধ ছিলেন দলের বড় অস্ত্র।
হঠাৎ দুঃসংবাদ
শীর্ষে ওঠার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি চট্টগ্রাম রয়্যালসের শিবিরে। সিলেট টাইটান্সের বিপক্ষে ম্যাচে বোলিং করার সময় হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়েন মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ। ইনিংসের পঞ্চম ওভারে মাত্র দুই বল করার পরই অস্বস্তি অনুভব করেন তিনি। এরপর আর বোলিং চালিয়ে যেতে না পেরে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন এই পেসার।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত
ইনজুরিতে পড়ার আগেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ রেখেছিলেন মুগ্ধ। তার দুর্দান্ত একটি ডেলিভারিতে সিলেটের অধিনায়ক মিরাজকে আউট করেন তিনি। ওই উইকেট ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এরপরই চোটের কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়, যা চট্টগ্রাম রয়্যালসের জন্য বড় ধাক্কা।
বিকল্প পরিকল্পনা
মুগ্ধ মাঠ ছাড়ার পর তার ওভারের বাকি চার বল করেন পাকিস্তানের পেসার মির্জা তাহির বেগ। তিনি চাপ সামলে বোলিং সম্পন্ন করেন। এই ঘটনাই দেখিয়েছে, চট্টগ্রাম রয়্যালস এখন দলগতভাবে কতটা সংগঠিত।
ফিজিওর আপডেট
দলের ফিজিও এনামুল হক জানিয়েছেন, মুগ্ধর ইনজুরি গুরুতর নয়। প্রাথমিকভাবে এটি হালকা হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেইন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও চিকিৎসা পেলে তিনি দ্রুত মাঠে ফিরতে পারেন। তবে পরের এক বা দুই ম্যাচে তাকে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের সামনে চ্যালেঞ্জ
মুগ্ধ যদি একাধিক ম্যাচ মিস করেন, তাহলে চট্টগ্রাম রয়্যালসের বোলিং আক্রমণে কিছুটা চাপ পড়বে। কারণ নতুন বলে উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রে তার বিকল্প সহজে পাওয়া যাবে না। কোচিং স্টাফকে তাই বোলিং কম্বিনেশন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
বিদেশি ক্রিকেটারদের ভূমিকা
পরবর্তী ম্যাচগুলোতে বিদেশি ক্রিকেটারদের পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারলে চট্টগ্রাম রয়্যালস আরও শক্তিশালী হবে। শুরুতে সীমিত বিদেশি শক্তি নিয়েও যে আত্মবিশ্বাস তারা দেখিয়েছে, তা দলের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ।
পয়েন্ট টেবিলের হিসাব
বিপিএল ২০২৬-এর এই পর্যায়ে এসে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা মানে বাড়তি চাপ। প্রতিটি দলই এখন চট্টগ্রাম রয়্যালসকে টার্গেট করে খেলবে। ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সমর্থকদের প্রত্যাশা
চট্টগ্রামের সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরেই বিপিএলে শিরোপার স্বপ্ন দেখে আসছেন। এবারের দল গঠনের শুরুটা যতটা অগোছালো ছিল, মাঠের পারফরম্যান্স ততটাই আশাব্যঞ্জক। মুগ্ধ দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরলে এই স্বপ্ন আরও বাস্তব রূপ পেতে পারে।
প্রশ্ন–উত্তর
চট্টগ্রাম রয়্যালস কেন আলোচনায়
অল্প প্রস্তুতি ও সংকটের মধ্যেও শীর্ষে ওঠার কারণে চট্টগ্রাম রয়্যালস আলোচনায়।
মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ কবে ফিরতে পারেন
ফিজিওর মতে, ইনজুরি গুরুতর নয়। বিশ্রাম পেলে দ্রুত ফেরার সম্ভাবনা আছে।
দলটি কি শিরোপার দাবিদার
বর্তমান ফর্ম ও দলগত পারফরম্যান্স বিবেচনায় চট্টগ্রাম রয়্যালস অবশ্যই শিরোপার দৌড়ে আছে।
উপসংহার
বিপিএল ২০২৬-এ চট্টগ্রাম রয়্যালস প্রমাণ করেছে, কাগজে-কলমের শক্তির চেয়েও মাঠের মানসিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মালিকানা সংকট, সীমিত প্রস্তুতি আর ইনজুরি—সব বাধা পেরিয়েও তারা পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধর ইনজুরি সাময়িক দুশ্চিন্তা তৈরি করলেও, দলের সামগ্রিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে এবারের বিপিএলে চট্টগ্রাম রয়্যালস ইতিহাস গড়তেই পারে।
